মনে পড়ে যায় অতীতের দিনগুলি
‘স্মৃতিচারণ’ (১১ অক্টোবর ২০১৬...)
রাস্তা থেকে ছিটকে নদীতে পড়ে যাওয়াতেও কোনো কষ্ট হচ্ছিলো না। যতটা আফসোস হয়েছিল নতুন জুতা জোড়া থেকে একটা জুতা স্রোতে ভেসে যাওয়ায়!...
ছুটির দিনে ঘুরে বেড়ানো আর প্রকৃতির মনোরম পরিবেশকে উপভোগ করতে কে না ভালোবাসে? আমিও কিন্তু এর ব্যতিক্রম ছিলাম না। একটু সুযোগ পেলেই ঘুরতে বের হতাম। এই গ্রাম ওই গ্রাম, এই এলাকা ওই এলাকা, এভাবে ঘুরে বেড়াতে আমার বেশ ভালোই লাগে। একেক দিন একেক এলাকায় মনের সুখে ঘুরে বেড়াতাম আর উপভোগ করতাম রূপসী বাংলার বৈচিত্র্যময় প্রকৃতিকে। ঘুরে বেড়ানোর মধ্য দিয়েই বিভিন্ন এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানা হতো। মানুষের সুখ-দুঃখ, আর হাসি-কান্নাগুলোকে অনুভব করতাম হৃদয় দিয়ে। তবে নদী এলাকাগুলোর দিকে আকর্ষণ একটু বেশিই ছিল। নদী পাড়ের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি হৃদয়ে কোমল পরশ বুলিয়ে এনে দেয় তৃপ্ততা। তবে নদী এলাকার মানুষগুলোর দুঃখ-দুর্দশা হৃদয়টাকে ভেঙ্গে দেয়।
হাই স্কুল জীবনের প্রত্যেকটি ছুটির দিন, বিশেষ করে শুক্রবার গুলো ছিল আমার ঘুরে বেড়ানোর রুটিন। এ ঘুরে বেড়ানোয় সঙ্গিরও কোন অভাব ছিল না। কোনদিন একা, আবার কোনদিন দুইজন, তিনজন বা দলবদ্ধ ভাবেও ঘুরতাম। তবে পয়সা খরচ করে কোন যানবাহনে চড়ে যাওয়ার মত মানুষ আমি ছিলাম না। নিজের বাইসাইকেলটাকে সাথে নিয়েই যত দূরে যাওয়া যায় সেটাই ছিল আমার গণ্ডি। সকালবেলা বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় দুপুরের খাবারের জন্য পকেটে সামান্য কিছু টাকা নিতাম। দুপুর গড়ালে সেটা দিয়েই সেড়ে দিতাম। সব জায়গায় তো আর বড় বড় হোটেল রেস্তোরা থাকেনা। অনেক সময় কোথাও গিয়ে ভারী খাবার না পেলেও সেসব নিয়ে কিন্তু কোন মাথাব্যথা ছিল না আমার। কোন ছোটোখাটো চায়ের দোকানে গিয়ে হালকা নাস্তা করে নিতাম। এক কথায় বলা যেতে পারে, খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে ছিল এক প্রকার উদাসীনতা। তবে নিয়ম ছিল, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। যার ফলে এ ঘুরে বেড়ানোর মাঝে কোন প্রকার বাধা-বিপত্তি ছিল না।
যাই হোক, আজকে আমি শেয়ার করব ঠিক ছয় বছর আগে ঘুরতে গিয়ে ঘটে যাওয়া ছোট্ট একটা ঘটনা। দিনটি ছিল ২০১৬ সালের ১৬ই অক্টোবর। সেদিন ছিল সনাতন ধর্মালম্বীদের বিজয়া নবমী। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব “শারদীয় দুর্গাপূজা” উপলক্ষে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। সে বছর আমাদের উপজেলায় ৬৫ টি পূজা মন্ডপে পূজা উদযাপন হওয়ার কথা ছিল। পূজা উদযাপন পরিষদের কাছ থেকে পূজা মন্ডপ গুলির নামের তালিকাটা নিয়েছিলাম। ভাবলাম সপ্তমী, অষ্টমী, আর নবমী এই তিন দিনে আমাদের উপজেলার ৬৫টি পূজা মন্ডপই ঘুরে দেখব। প্রত্যেকটারই ছবি তুলে নিয়ে এসে তুলনা করতে হবে সবচেয়ে সৌন্দর্যময় হয়েছিল কোনটা! সেই ভাবনার সূত্র ধরেই চলা শুরু। প্রথম দুই দিনে ৪২ টি মন্ডপ দর্শন হলো। শেষ দিনে বাকি কয়েকটা ঘুরে তালিকাটা হাতে নিয়ে দেখলাম একটিতে পূজা উদযাপন বন্ধ থাকায় মোট ৬৪ টি মণ্ডপ ঘুরে দেখা হয়েছে। ততক্ষণে আমি পৌঁছে গেছিলাম ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের খোলার হাট বাজারে। গোটা উপজেলার সবগুলো পূজা মন্ডপকে বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের পালপাড়ার পূজা মন্ডপটিই ছিল সার্বিকভাবে সেরা।
বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। এখন বাড়ি ফেরার পালা। পথিমধ্যে বন্ধু নাহিদের বাড়িতে হালকা বিরতি নিলাম। বারান্দায় বসে সকলের সাথে কুশলাদি বিনিময় হচ্ছে। এদিকে, বাড়ির মূল ফটকের সামনে মই বেয়ে গাছে উঠে টেলিভিশনের ডিস সংযোগের কাজ করছেন মিস্ত্রী। কাজ শেষ করে নামার সময় আকস্মিকভাবে মই ভেঙে নিচে পড়ে গেলেন তিনি! সবাই মিলে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দেখি, আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে প্রায়। তখন আবার তাকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয় গেল। ডাক্তার বাবুকে ফোন! তার কিছুক্ষণ পরেই মিস্ত্রী সাহেব। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন তিনি। সকলের শঙ্কা কেটে যাওয়ায় ওখানে আর সেই মুহূর্তে ডাক্তারকে আসার প্রয়োজন হলো না। মিস্ত্রী সাহেব নিজেই ডাক্তারের কাছে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারবেন।
এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। নাহিদের বাড়ি থেকে রওয়ানা করলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। খড়িবাড়ি বাজার হয়ে চলে আসবো। কিন্ত মধ্য পথে আবারও ঘটে গেল আরেক দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনা হলেও সেটা অনেকটাই হাস্যকর ছিল! সেদিন সাথে ছিল বন্ধুবর লিমন। আমরা দু'জনই আলাদা বাইসাইকেলে ছিলাম। আমি ছিলাম সামনে, আর আমার পিছন পিছন আসছে লিমন। তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। আবছা আলোয় দৃষ্টি বেশী দূরে যায় না। বড়লই থেকে খড়িবাড়ী যাবার পথে একটা ব্রিজ পার হতেই সামনে দেখি একটা মহিষের গাড়ি। মুখোমুখি সংঘর্ষ হওয়ার মত অবস্থা। অমনি এক সাইড হতে পারলেও সামনে ছিল বিশাল গর্ত। কষে ব্রেইক চেপে মাটিতে পা দিয়ে স্ট্যান্ড করবো। সাইকেল থেকে সেই জায়গাটা অনেক ঢালু হওয়ায় পা দিয়ে মাটি স্পর্শ করতে পারলাম না। সাইকেল সহ পড়ে গেলাম ব্রীজের সাইড রেলিংয়ের ওপর।
আমার কোমর থেকে পা পর্যন্ত রাস্তার দিকে আর কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত ছিল নদীর দিকে। বাইসাইকেলটাও একই রকম দশা। দুই দিকে সমান সমান ভার থাকায় টলোমলো করছিলাম শুধু। কোথাও কোন আকর্ষণ খাটাতে পারছিলাম না। সাইকেলটা ছেড়ে দেয়ার পর তার উপর আবার আমি পড়ে গেলে বড় রকমের রক্তাক্ত যখম হতে পারে। এমনটা ভেবে তখনো কিন্তু বাইসাইকেলের দুই হ্যান্ডেল দুই হাতে শক্ত করেই ধরা ছিল। বেশ কয়েক সেকেন্ড ওখানে দোল খাচ্ছিলাম আর বন্ধু লিমনকে ডাকছিলাম।
সেখানে কিন্তু আমার সমবয়সী একটা ছেলে রেলিং এর উপর বসা ছিল। সে গভীর মনোযোগের সাথে ফোন টিপছে। আর আমি কিন্তু তার শরীর ঘেঁষেই পড়ে গেছিলাম। ফোনের দিকে মনোযোগ থাকায় ঘটনাগুলোকে ততটা খেয়ালই করতে পারেনি সে। শব্দ শোনার পর তড়িঘড়ি করে উঠে সে আমার পায়ের দিকে টেনে ধরে। তখন আমি তাকে বললাম ভাই শক্ত করে ধরেন ছেড়ে দেন না। তবে টেনে তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও সে একা আটকাতেই পারছিল না। যার ফলে আমি আরো বেশ কিছুক্ষণ সেখানে ঝুলতে থাকি।
ততক্ষণে লিমন এসে যোগ দেয় তার সাথে। দুজনে পা ধরে টেনে উপরের দিকে তোলার চেষ্টা করলেও আমি আরো বেশি নদীর দিকে ঝুলে গেলাম। লিমন এক হাত দিয়ে সাইকেলের ক্যারিয়ারটা চেপে ধরেছে। এদিকে আমার পা থেকে হাত ফসকে গিয়ে খুলে গেলেও প্যান্টটা তার হাতে ধরা আছে। প্যান্টটা খুলে যাবে যাবে অবস্থা প্রায়। আমার মনে হচ্ছিল যে প্যান্টটা বুঝি তাদের হাতেই থাকবে আর আমি পড়ে যাব নদীতে! না, কিন্তু সেরকম কোন ঘটনা ঘটে নাই! দুজনে অনেক চেষ্টা করার পরও শেষ পর্যন্ত আর আটকাতে পারল না। আর আমিও সাইকেল সহ পড়ে গেলাম নিচে। গভীরতা অনেক বেশি ছিল। মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা, যে আমার কোনো ক্ষয় ক্ষতি হয়নি।
সাইকেলটা নতুন ছিল। আর নতুন জিনিসের প্রতি কার না মায়া থাকে? আমারও মায়া ছিল! তাই সাইকেলটাকে রেখে আমি উঠে আসতে পারি নাই। সাইকেলটাকে সাথে নিয়েই কিনারে আসছিলাম। যদিও কিনারে এসে চাপলাম, সেখানকারও গভীরতা ছিল অনেক। আর পাড় মোটামুটি উঁচু হওয়ায় উঠতে পারছিলাম না। এই সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকটা ছেলে এসে সেখানে জড়ো হয়েছে। কয়েকটা ছেলে আমাকে টেনে তোলার উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমিও উপর দিকে হাত দিচ্ছি ধরার জন্য। অনেক টানা হেঁচড়া করে পাড়ে টেনে তুলল। উঠে দেখি ততক্ষনে আমার ফোনটা অচল হয়ে গেছে। একটা জুতাও পায়ে ছিল, কিন্তু আরেকটা স্রোতের ধারায় ভেসে চলে গেছে!
এই ভেজা অবস্থায় এত দুর থেকে বাড়ী ফেরা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ওখান থেকে নাহিদের বাড়ি প্রায় ৩ কিঃমিঃ দুরে। লিমন নাহিদকে ফোন করে একটা লুঙ্গি ও টি শার্ট নিয়ে ডাক দিল। ইতোমধ্যে সেখানে অনেক লোক জমেছে। ঘটনা জানতে সবাই অনেক আগ্রহী। প্রত্যক্ষদর্শী দুইজনের কাছ থেকে ঘটনার বিবরণ শুনে কেউ খুশ খুশ করে হাসছেন আবার কেউ আফসোস করছেন। আবার কেউ আবেগী মনে আমার দিকে এসে ক্ষয়-ক্ষতির খোঁজ খবর নিচ্ছেন। অনেকেই আবার নিয়ে আসছেন আষাঢ়ে গল্প! ওখানে ভূতের ভয় আছে! ওখানে অনেকেরই অনেক রকমের সমস্যায় পড়েছেন! এরকম নানান কল্পকাহিনী! এর মাঝেই নাহিদ লুঙ্গি ও টি-শার্ট নিয়ে এসে হাজির। ভেজা কাপড় পরিধান করা অবস্থায় থাকার ফলে ঠান্ডা লাগতে শুরু করেছে। আমি কারো কোনো কল্পকাহিনীর দিকে কর্ণপাত না করে, দ্রুত কাপড় পরিবর্তন করে চলে এলাম।
#nurnobifulkuri
11 October 2022
রাস্তা থেকে ছিটকে নদীতে পড়ে যাওয়াতেও কোনো কষ্ট হচ্ছিলো না। যতটা আফসোস হয়েছিল নতুন জুতা জোড়া থেকে একটা জুতা স্রোতে ভেসে যাওয়ায়!...
ছুটির দিনে ঘুরে বেড়ানো আর প্রকৃতির মনোরম পরিবেশকে উপভোগ করতে কে না ভালোবাসে? আমিও কিন্তু এর ব্যতিক্রম ছিলাম না। একটু সুযোগ পেলেই ঘুরতে বের হতাম। এই গ্রাম ওই গ্রাম, এই এলাকা ওই এলাকা, এভাবে ঘুরে বেড়াতে আমার বেশ ভালোই লাগে। একেক দিন একেক এলাকায় মনের সুখে ঘুরে বেড়াতাম আর উপভোগ করতাম রূপসী বাংলার বৈচিত্র্যময় প্রকৃতিকে। ঘুরে বেড়ানোর মধ্য দিয়েই বিভিন্ন এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানা হতো। মানুষের সুখ-দুঃখ, আর হাসি-কান্নাগুলোকে অনুভব করতাম হৃদয় দিয়ে। তবে নদী এলাকাগুলোর দিকে আকর্ষণ একটু বেশিই ছিল। নদী পাড়ের বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি হৃদয়ে কোমল পরশ বুলিয়ে এনে দেয় তৃপ্ততা। তবে নদী এলাকার মানুষগুলোর দুঃখ-দুর্দশা হৃদয়টাকে ভেঙ্গে দেয়।
হাই স্কুল জীবনের প্রত্যেকটি ছুটির দিন, বিশেষ করে শুক্রবার গুলো ছিল আমার ঘুরে বেড়ানোর রুটিন। এ ঘুরে বেড়ানোয় সঙ্গিরও কোন অভাব ছিল না। কোনদিন একা, আবার কোনদিন দুইজন, তিনজন বা দলবদ্ধ ভাবেও ঘুরতাম। তবে পয়সা খরচ করে কোন যানবাহনে চড়ে যাওয়ার মত মানুষ আমি ছিলাম না। নিজের বাইসাইকেলটাকে সাথে নিয়েই যত দূরে যাওয়া যায় সেটাই ছিল আমার গণ্ডি। সকালবেলা বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় দুপুরের খাবারের জন্য পকেটে সামান্য কিছু টাকা নিতাম। দুপুর গড়ালে সেটা দিয়েই সেড়ে দিতাম। সব জায়গায় তো আর বড় বড় হোটেল রেস্তোরা থাকেনা। অনেক সময় কোথাও গিয়ে ভারী খাবার না পেলেও সেসব নিয়ে কিন্তু কোন মাথাব্যথা ছিল না আমার। কোন ছোটোখাটো চায়ের দোকানে গিয়ে হালকা নাস্তা করে নিতাম। এক কথায় বলা যেতে পারে, খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে ছিল এক প্রকার উদাসীনতা। তবে নিয়ম ছিল, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। যার ফলে এ ঘুরে বেড়ানোর মাঝে কোন প্রকার বাধা-বিপত্তি ছিল না।
যাই হোক, আজকে আমি শেয়ার করব ঠিক ছয় বছর আগে ঘুরতে গিয়ে ঘটে যাওয়া ছোট্ট একটা ঘটনা। দিনটি ছিল ২০১৬ সালের ১৬ই অক্টোবর। সেদিন ছিল সনাতন ধর্মালম্বীদের বিজয়া নবমী। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব “শারদীয় দুর্গাপূজা” উপলক্ষে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। সে বছর আমাদের উপজেলায় ৬৫ টি পূজা মন্ডপে পূজা উদযাপন হওয়ার কথা ছিল। পূজা উদযাপন পরিষদের কাছ থেকে পূজা মন্ডপ গুলির নামের তালিকাটা নিয়েছিলাম। ভাবলাম সপ্তমী, অষ্টমী, আর নবমী এই তিন দিনে আমাদের উপজেলার ৬৫টি পূজা মন্ডপই ঘুরে দেখব। প্রত্যেকটারই ছবি তুলে নিয়ে এসে তুলনা করতে হবে সবচেয়ে সৌন্দর্যময় হয়েছিল কোনটা! সেই ভাবনার সূত্র ধরেই চলা শুরু। প্রথম দুই দিনে ৪২ টি মন্ডপ দর্শন হলো। শেষ দিনে বাকি কয়েকটা ঘুরে তালিকাটা হাতে নিয়ে দেখলাম একটিতে পূজা উদযাপন বন্ধ থাকায় মোট ৬৪ টি মণ্ডপ ঘুরে দেখা হয়েছে। ততক্ষণে আমি পৌঁছে গেছিলাম ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের খোলার হাট বাজারে। গোটা উপজেলার সবগুলো পূজা মন্ডপকে বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের পালপাড়ার পূজা মন্ডপটিই ছিল সার্বিকভাবে সেরা।
বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। এখন বাড়ি ফেরার পালা। পথিমধ্যে বন্ধু নাহিদের বাড়িতে হালকা বিরতি নিলাম। বারান্দায় বসে সকলের সাথে কুশলাদি বিনিময় হচ্ছে। এদিকে, বাড়ির মূল ফটকের সামনে মই বেয়ে গাছে উঠে টেলিভিশনের ডিস সংযোগের কাজ করছেন মিস্ত্রী। কাজ শেষ করে নামার সময় আকস্মিকভাবে মই ভেঙে নিচে পড়ে গেলেন তিনি! সবাই মিলে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দেখি, আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে প্রায়। তখন আবার তাকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয় গেল। ডাক্তার বাবুকে ফোন! তার কিছুক্ষণ পরেই মিস্ত্রী সাহেব। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন তিনি। সকলের শঙ্কা কেটে যাওয়ায় ওখানে আর সেই মুহূর্তে ডাক্তারকে আসার প্রয়োজন হলো না। মিস্ত্রী সাহেব নিজেই ডাক্তারের কাছে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারবেন।
এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। নাহিদের বাড়ি থেকে রওয়ানা করলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। খড়িবাড়ি বাজার হয়ে চলে আসবো। কিন্ত মধ্য পথে আবারও ঘটে গেল আরেক দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনা হলেও সেটা অনেকটাই হাস্যকর ছিল! সেদিন সাথে ছিল বন্ধুবর লিমন। আমরা দু'জনই আলাদা বাইসাইকেলে ছিলাম। আমি ছিলাম সামনে, আর আমার পিছন পিছন আসছে লিমন। তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। আবছা আলোয় দৃষ্টি বেশী দূরে যায় না। বড়লই থেকে খড়িবাড়ী যাবার পথে একটা ব্রিজ পার হতেই সামনে দেখি একটা মহিষের গাড়ি। মুখোমুখি সংঘর্ষ হওয়ার মত অবস্থা। অমনি এক সাইড হতে পারলেও সামনে ছিল বিশাল গর্ত। কষে ব্রেইক চেপে মাটিতে পা দিয়ে স্ট্যান্ড করবো। সাইকেল থেকে সেই জায়গাটা অনেক ঢালু হওয়ায় পা দিয়ে মাটি স্পর্শ করতে পারলাম না। সাইকেল সহ পড়ে গেলাম ব্রীজের সাইড রেলিংয়ের ওপর।
আমার কোমর থেকে পা পর্যন্ত রাস্তার দিকে আর কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত ছিল নদীর দিকে। বাইসাইকেলটাও একই রকম দশা। দুই দিকে সমান সমান ভার থাকায় টলোমলো করছিলাম শুধু। কোথাও কোন আকর্ষণ খাটাতে পারছিলাম না। সাইকেলটা ছেড়ে দেয়ার পর তার উপর আবার আমি পড়ে গেলে বড় রকমের রক্তাক্ত যখম হতে পারে। এমনটা ভেবে তখনো কিন্তু বাইসাইকেলের দুই হ্যান্ডেল দুই হাতে শক্ত করেই ধরা ছিল। বেশ কয়েক সেকেন্ড ওখানে দোল খাচ্ছিলাম আর বন্ধু লিমনকে ডাকছিলাম।
সেখানে কিন্তু আমার সমবয়সী একটা ছেলে রেলিং এর উপর বসা ছিল। সে গভীর মনোযোগের সাথে ফোন টিপছে। আর আমি কিন্তু তার শরীর ঘেঁষেই পড়ে গেছিলাম। ফোনের দিকে মনোযোগ থাকায় ঘটনাগুলোকে ততটা খেয়ালই করতে পারেনি সে। শব্দ শোনার পর তড়িঘড়ি করে উঠে সে আমার পায়ের দিকে টেনে ধরে। তখন আমি তাকে বললাম ভাই শক্ত করে ধরেন ছেড়ে দেন না। তবে টেনে তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও সে একা আটকাতেই পারছিল না। যার ফলে আমি আরো বেশ কিছুক্ষণ সেখানে ঝুলতে থাকি।
ততক্ষণে লিমন এসে যোগ দেয় তার সাথে। দুজনে পা ধরে টেনে উপরের দিকে তোলার চেষ্টা করলেও আমি আরো বেশি নদীর দিকে ঝুলে গেলাম। লিমন এক হাত দিয়ে সাইকেলের ক্যারিয়ারটা চেপে ধরেছে। এদিকে আমার পা থেকে হাত ফসকে গিয়ে খুলে গেলেও প্যান্টটা তার হাতে ধরা আছে। প্যান্টটা খুলে যাবে যাবে অবস্থা প্রায়। আমার মনে হচ্ছিল যে প্যান্টটা বুঝি তাদের হাতেই থাকবে আর আমি পড়ে যাব নদীতে! না, কিন্তু সেরকম কোন ঘটনা ঘটে নাই! দুজনে অনেক চেষ্টা করার পরও শেষ পর্যন্ত আর আটকাতে পারল না। আর আমিও সাইকেল সহ পড়ে গেলাম নিচে। গভীরতা অনেক বেশি ছিল। মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা, যে আমার কোনো ক্ষয় ক্ষতি হয়নি।
সাইকেলটা নতুন ছিল। আর নতুন জিনিসের প্রতি কার না মায়া থাকে? আমারও মায়া ছিল! তাই সাইকেলটাকে রেখে আমি উঠে আসতে পারি নাই। সাইকেলটাকে সাথে নিয়েই কিনারে আসছিলাম। যদিও কিনারে এসে চাপলাম, সেখানকারও গভীরতা ছিল অনেক। আর পাড় মোটামুটি উঁচু হওয়ায় উঠতে পারছিলাম না। এই সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকটা ছেলে এসে সেখানে জড়ো হয়েছে। কয়েকটা ছেলে আমাকে টেনে তোলার উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমিও উপর দিকে হাত দিচ্ছি ধরার জন্য। অনেক টানা হেঁচড়া করে পাড়ে টেনে তুলল। উঠে দেখি ততক্ষনে আমার ফোনটা অচল হয়ে গেছে। একটা জুতাও পায়ে ছিল, কিন্তু আরেকটা স্রোতের ধারায় ভেসে চলে গেছে!
এই ভেজা অবস্থায় এত দুর থেকে বাড়ী ফেরা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ওখান থেকে নাহিদের বাড়ি প্রায় ৩ কিঃমিঃ দুরে। লিমন নাহিদকে ফোন করে একটা লুঙ্গি ও টি শার্ট নিয়ে ডাক দিল। ইতোমধ্যে সেখানে অনেক লোক জমেছে। ঘটনা জানতে সবাই অনেক আগ্রহী। প্রত্যক্ষদর্শী দুইজনের কাছ থেকে ঘটনার বিবরণ শুনে কেউ খুশ খুশ করে হাসছেন আবার কেউ আফসোস করছেন। আবার কেউ আবেগী মনে আমার দিকে এসে ক্ষয়-ক্ষতির খোঁজ খবর নিচ্ছেন। অনেকেই আবার নিয়ে আসছেন আষাঢ়ে গল্প! ওখানে ভূতের ভয় আছে! ওখানে অনেকেরই অনেক রকমের সমস্যায় পড়েছেন! এরকম নানান কল্পকাহিনী! এর মাঝেই নাহিদ লুঙ্গি ও টি-শার্ট নিয়ে এসে হাজির। ভেজা কাপড় পরিধান করা অবস্থায় থাকার ফলে ঠান্ডা লাগতে শুরু করেছে। আমি কারো কোনো কল্পকাহিনীর দিকে কর্ণপাত না করে, দ্রুত কাপড় পরিবর্তন করে চলে এলাম।
#nurnobifulkuri
11 October 2022
মন্তব্য যোগ করুন
এই লেখার উপর আপনার মন্তব্য জানাতে নিচের ফরমটি ব্যবহার করুন।
মন্তব্যসমূহ
-
শঙ্খজিৎ ভট্টাচার্য ১৬/০৩/২০২৫দারুণ
-
ফয়জুল মহী ১৩/০৩/২০২৫দারুণ অনুভূতির প্রকাশ